জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে কয়েক বছর ধরে ভুগছে ইউরোপের দেশগুলো, যা কিনা অঞ্চলটির মন্থর প্রবৃদ্ধির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। পাশাপাশি পুরনো প্রযুক্তি ও অবকাঠামো শিল্প খাতগুলো নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ জ্বালানি মূল্য এবং এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের নতুন প্লান্টের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গিয়ে ইউরোপের কার্যক্রম পর্যালোচনা করছে অনেক কেমিক্যাল কোম্পানি। এর মধ্যে কেউ কেউ ইউরোপে থাকা সম্পদ বিক্রির উদ্যোগ নিচ্ছে।
এফটির গতকালের এক প্রতিবেদনে বেশ কয়েকটি কেমিক্যাল জায়ান্টের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হয়েছে। ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হচ্ছে, সৌদি কেমিক্যাল কোম্পানি সাবিক ইউরোপে তাদের পেট্রোকেমিক্যাল ব্যবসা বিক্রি ও অন্যান্য বিকল্প সম্ভাবনা নিয়ে ভাবছে। এরই মধ্যে ব্যাংকারদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন কোম্পানির কর্মকর্তারা। এছাড়া ডাও, লিওনডেলবেসেল, শেল ও বিপির মতো শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি ইউরোপের সম্পদ নিয়ে একাধিক বিকল্প বিবেচনা করছে।
ইউরোপীয় কেমিক্যাল কোম্পানিগুলোর বৈশ্বিক অংশীদারত্ব প্রায় ২০-২৫ শতাংশ এবং অঞ্চলটি বিশ্বের প্রধান কেমিক্যাল উৎপাদন ও সরবরাহের উৎস। বৃহৎ আকার ও বৈশ্বিক প্রভাব সত্ত্বেও কিছু সমস্যা ইউরোপীয় এ শিল্পকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। ইউরোপে শিল্পোৎপাদন আয়ে কেমিক্যাল খাতের হিস্যা ৫-৭ শতাংশ। এতে মোট কর্মসংস্থানের সংখ্যা ১২ লাখের বেশি।
একসময় ইউরোপের জ্বালানির প্রধান উৎস ছিল রাশিয়া। ইউক্রেন আক্রমণের প্রেক্ষাপটে দেশটির রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় পশ্চিমারা। এর প্রভাবে ২০২২ সাল থেকে ইউরোপে জ্বালানি ব্যয় অনেকটাই বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন কেমিক্যাল কারখানা গড়ে উঠছে।
বেনারবার্গ ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের কেমিক্যাল গবেষণা বিভাগের প্রধান সেবাস্টিয়ান ব্রের মতে, চীন ও মধ্যপ্রাচ্যে গত কয়েক বছরে নতুন নতুন প্লান্ট তৈরি হয়েছে। এতে বিশ্বব্যাপী কেমিক্যাল সরবরাহ বাড়ছে। বিষয়টি আমলে নিয়ে ইউরোপীয় প্লান্টগুলোর মালিকরা ভাবছেন, এখানকার পুরনো প্লান্ট চালু রেখে প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাওয়া বোধহয় সম্ভব নয়। জ্বালানির দাম প্রসঙ্গে সেবাস্টিয়ান ব্রে বলেন, ‘যে বিষয়টি কোম্পানিগুলোকে ইউরোপীয় সম্পদ বিক্রির দিকে ঠেলে দিচ্ছে, সেটি হলো উচ্চ জ্বালানি খরচ।’
ইউরোপীয় কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি কাউন্সিল জানায়, গত দুই বছরে অঞ্চলটিতে ১ কোটি ১০ লাখ টনের বেশি কেমিক্যাল উৎপাদন বন্ধ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর প্রভাব পড়বে ২১টি বড় প্লান্টে।
সংস্থাটি আরো জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইউরোপে গ্যাসের দাম চার-পাঁচ গুণ বেশি। ফলে চাপে রয়েছে খাতটির প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান। তাই এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ আশা করা হচ্ছে।
সৌদি সরকার প্রতিষ্ঠিত সাবিকের মালিকানার বড় অংশ রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল সংস্থা সৌদি আরামকোর কাছে। তারা এখন বিনিয়োগ ব্যাংক ল্যাজার্ড ও গোল্ডম্যান স্যাকসের সঙ্গে ইউরোপীয় সম্পদ বিক্রির প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করছে। ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলছে, ইউরোপে সাবিকের পেট্রোকেমিক্যাল সম্পদ থেকে বছরে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার আয় হয়। এর মধ্যে কর, অবচয়, সুদ ও অন্যান্য খরচ বাদে আয় প্রায় ২৫ কোটি মিলিয়ন ডলার। সম্পদ বিক্রি নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। অবশ্য বিষয়টি নিয়ে সাবিক বা ল্যাজার্ড ও গোল্ডম্যান স্যাকস কোনো পক্ষই মন্তব্য করেনি।
অন্যদিকে ডাও গত অক্টোবরে জানিয়েছিল, তারা ইউরোপে কিছু সম্পদ নিয়ে কৌশলগত পর্যালোচনার পরিকল্পনা করছে। এর আগে মে মাসে হিউস্টনভিত্তিক লিওনডেলবেসেল ইউরোপীয় সম্পদ নিয়ে কৌশলগত পর্যালোচনা শুরুর কথা জানায়।
ডাওয়ের সিইও ও চেয়ার জিম ফিটারলিং বলেন, ‘অনেক খাত ও মূল্য শৃঙ্খলে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে ইউরোপের নিয়ন্ত্রক পরিবেশ। আমরা ইউরোপে নির্দিষ্ট কিছু সম্পদের কৌশলগত পর্যালোচনা শুরু করছি, বিশেষ করে পলিউরেথেন ব্যবসা নিয়ে ভাবছি।’
আইনোসের মালিক ও বিলিয়নেয়ার স্যার জিম র্যাটক্লিফ অনেক দিন ধরে ইউরোপের কেমিক্যাল শিল্প নিয়ে সতর্ক করে আসছেন। যেখানে তিনি অঞ্চলটির কার্বন নিরপেক্ষ লক্ষ্য নিয়েও সমালোচনা করেন। জিম র্যাটক্লিফের মতে, উচ্চ জ্বালানি খরচ এবং কার্বন ট্যাক্সের কারণে যুক্তরাজ্যের কেমিক্যাল শিল্প ধ্বংসের মুখে।
জানুয়ারিতে জিম র্যাটক্লিফ বলেন, ‘আমরা দেখছি আমাদের প্রধান শিল্পগুলোর একটি কেমিক্যাল উৎপাদনের প্রাণ যেন নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।’ গত সপ্তাহে তিনি যুক্তরাজ্যকে করনীতি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।
কোনো কোনো কোম্পানি এরই মধ্যে ব্যবসা হস্তান্তর শুরু করেছে। আইনোস গত মার্চে প্লাস্টিক তৈরির রেজিন ও কোটিং সরবরাহকারী কম্পোজিট ব্যবসা ১৭০ কোটি ইউরোয় কেপিএস ক্যাপিটাল পার্টনার্সের কাছে বিক্রি করে। এ ব্যবসার অধীনে ইউরোপ, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে ১৭টি প্লান্ট পরিচালিত হতো।
অবশ্য কম দামে জ্বালানি প্রাপ্তি এবং দামে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ইউরোপীয় কেমিক্যাল কোম্পানিগুলো বিকল্প উৎসও খুঁজে আসছে।
আইনোসের একটি উদ্যোগ থেকে সে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সম্প্রতি আরেক কেমিক্যাল কোম্পানি কোভেস্ট্রোর সঙ্গে আট বছরের জন্য মার্কিন গ্যাস সরবরাহ চুক্তি করেছে তারা।
কেমিক্যাল খাতের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নেট্রিয়াম ক্যাপিটালের সিইও আলাসডেয়ার নিসবেটের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ইউরোপের অনেক পুরনো বা অকার্যকর কেমিক্যাল প্লান্ট আর প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না। তাই কোম্পানিগুলো সে সম্পদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবছে। তারা বিক্রি, একীভূতকরণ বা বন্ধ করার মতো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।